ভালো কাজের মূল্যায়ন করা একটি সদাকা

housework
Image Source : www.freepik.com

আমাদের সমাজে ইতিবাচক চিন্তা ও ভালো কাজের মূল্যায়ন কম করা হয়। দেখা যায়, একটি ব্যর্থতার জন্য অন্য কতগুলো ভালো কাজ মূল্যায়িত হয় না।

মানুষের মন প্রকৃতিগতভাবে নেতিবাচক কিছুর প্রতি আটকে থাকে। প্রথম দৃষ্টিতে আমরা নেতিবাচক জিনিসটাই দেখি বা ভাবতে পছন্দ করি।

কেউ কেউ বলে থাকেন, ভালো কাজ তো এক্সপেক্টেড। এটার জন্য বাহবা পাওয়ার কিছু নেই।

সমাজে এইটাই দেখা যায়। ভালো কাজের স্বীকৃতি নেই। তবে কেউ মারা গেলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখি হয়, স্মৃতিচারণ হয়, মিডিয়ায় টকশো হয়।

ভালো কাজ করাটা যদি এক্সেপেক্টেডই হতো তাহলে আল্লাহ তায়ালা জান্নাতের পুরস্কারের কথা বলতেন না। শুধু তিরস্কার করেই শেষ করে দিতেন। কিন্তু তিনি প্রতিটি ভালো কাজের জন্যই আমাদেরকে পুরস্কৃত করবেন।

কারন তিনি জানেন, ভালো কাজ করতে বান্দাকে নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে হয়। নফস বা কুপ্রবৃত্তি সবসময় খারাপের দিকেই মানুষকে আকৃষ্ট করে। এ কারনেই তিনি শুধু খারাপ কাজের জন্যই শাস্তি দিবেন না বরং অনু পরিমান ভালো কাজ করলেও তার উপযুক্ত প্রতিদান দিবেন।

অবশ্য মূল্যায়ন হয় গুটিকয়েক ভালো কাজের জন্য। কেউ পরীক্ষায় ভালো ফল করলে, ভালো চাকরি পেলে সবাই প্রশংসায় ভাসায়। কিন্তু বাসার কাজ করলে তেমন মূল্যায়ন করে না।

বাড়িতে নারীরা সারাদিন কাজ করেন। তারা কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন পান? তাদের রান্নার প্রশংসা করা হয়? ‘আজ ঘরটা দেখতে খুব সুন্দর লাগছে। সত্যিই তোমার মতো এত সুন্দর পরিপাটি করে কেউ ঘর গুছিয়ে রাখতে পারে না।’ এমন কথা কেউ বলেন?

বেশিরভাগ সময়ই তারা তাদের কাজের মূল্যায়ন পান না। বরং তাদের শুনতে হয়, সারাদিন ঘরে থেকে কী করো?

কথাটা এমনভাবেই বলা হয় যেন তারা সারাদিন ঘরে শুয়ে বসে কাটায়। এতে তারা ঘরের কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। দায় ঠেকে কাজ করে। অথচ একই ঘরের কাজ করতে গেলে পুরুষদের খবর হয়ে যাবে।

হাতের কাছে অনেক কিছু রেডিমেড পাই তাই ঘরণীদের গুরুত্ব বুঝি না। যদি তাদের এই কাজগুলো নিজেকে করতে হতো, তাহলে হয়তো গুরুত্ব বুঝতাম এবং স্বীকৃতি দিতাম।

আচ্ছা বাড়িতে যেসব গৃহকর্মীরা কাজ করেন, কখনো বলেছি যে, তোমার আজকের কাজটা ভালো ছিল? এটা বলা হয়ে ওঠে না। বরং তারা নেতিবাচক মন্তব্য বেশি পেয়ে থাকে।

পারিশ্রমিক দেয়া ছাড়াও কাজের প্রশংসা করা হলে তারা ঘরের কাজটা আরো সুন্দরভাবে করার চেষ্টা করবে এবং সেটা ভালোবেসেই করবে।

শিশুদের প্রতিটি কাজেই ইতিবাচক প্রশংসা করা উচিত। তবে মোবাইলের ব্যবহার ব্যতীত। সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে মোবাইলের বিকল্প কাজ/পড়া বা খেলাধুলায় ব্যস্ত রাখতে। আর তাতে যদি ভালো কিছু করে তাহলে তাদের প্রশংসা এবং পুরস্কার করতে হবে। আশা করা যায় তাদের থেকে ভালো কিছু পাবে এই সমাজ।

আজকের শিশুরা যে মোবাইলের প্রতি আসক্ত, এটা কিন্তু হুট করে হয়নি। এর জন্য দায়ী অভিভাবকরা। কারন শিশুর যখন খেলার সাথী প্রয়োজন ছিল তখন তাদের সময় দেয়নি। বরং কাজের অজুহাতে তাদের হাতে ল্যাপটপ ও মোবাইল তুলে দেয়া হয়েছে। ভাত খেতে না চাইলে মোবাইলে কার্টুন ছেড়ে দেয়া হয়েছে। যার ফলে আজ এই শোচনীয় অবস্থা।

শিশুর কাজকে কিভাবে মূল্যায়ন করা যায়? শিশুকে সময় দেয়া, তাদের সাথে খেলা করা, তাদেরকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে যাওয়া, তারা যদি কোনো কাজে চেষ্টা করে তাতেও তাকে উৎসাহ দেয়া। এসব করলে সে আগের চেয়েও কাজটি উৎসাহ নিয়ে করবে।

অভিভাবকের উচিত সন্তানদের সাথে বন্ধুর মতো মেশা। যেন সন্তানরা বাবা-মার সাথে দ্বিধা ছাড়াই বলতে পারে। কিন্তু আমাদের সমাজে এটা খুব কমই দেখা যায়। সন্তানের সমস্যা নিয়ে পিতা-মাতারা যদি সন্তানের সাথেই বসে সমাধান করে সেটা কার্যকর হয়। এতে সন্তান ও তার পিতা-মাতার ভেতরে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

সন্তানদের অনেক মানুষের সামনে হরহামেশা বকাবাদ্য করা হয়। মনে করা হয় যে, এই ছোট মানুষের আবার সম্মান কিসের? কিন্তু সন্তানদের মনে পিতা-মাতার ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হয়। আর এভাবেই সন্তান ও পিতা-মাতার ভিতরে ক্রমশ দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। যা আদৌ কাম্য নয়।

একইসাথে সন্তানদেরও উচিত পিতা-মাতার সাথে সর্বোচ্চ ভালো ব্যবহার করা। তাদের মতামতকে সম্মান দেয়া এবং তাদের আচরণে অসঙ্গতি পেলে ধৈর্য ধরে বুঝানো যে কাজটা ঠিক না। পিতা-মাতার উচিত অযথা রাগ না করে সেই দোষ বা ত্রুটি যদি তাদের ভিতরে থাকে তাহলে নিজেকে সংশোধন করে নেওয়া। উভয় পক্ষ রাগারাগি করলে দূরত্ব বাড়তেই থাকবে, কখনো কমবে না।

ভালো কাজ সংক্রামক ব্যাধির ন্যায় ছড়াতে থাকে। আজ যদি সবার ভালো কাজের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় তাহলে সমাজে ভালো কাজ বেশি ছড়াবে। সবাই ভালো কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হবে।

প্রতিটি ভালো কাজের স্বীকৃতি দেয়া হলে এবং ভালো কাজের দিকে অনুপ্রাণিত করা হলে সমাজে ভালো কাজ করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। মানুষকে হতাশ করা যাবে না যেটা প্রায়ই করা হয়ে থাকে। যেমন তোকে দিয়ে কিছুই হবে না, ও তুমি বুঝবে না ইত্যাদি।

এই প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসূল সা. বলেছেন, সহজ করো, কঠিন করো না। মানুষকে আশা দেখাও, ভীত সন্ত্রস্ত করো না।